বাংলাদেশের দাবি ‘প্রতিষ্ঠিত চুক্তির আওতায় নিষ্পত্তি হয়েছে’: পাকিস্তান
Mofossal Barta
প্রকাশিত এপ্রিল ২৩, ২০২৫, ১৬:৪২ অপরাহ্ণ
যুগান্তর অনলাইন: রোহিঙ্গা সংকট ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে, আর আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের দৃঢ় সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রচেষ্টায় পাকিস্তান আরও সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে না কেন?
সংবাদটি শেয়ার করুন....
আবদুল মজিদ চৌধুরী:সম্প্রতি পাকিস্তান পররাষ্ট্র সচিব আমনা বালুচের ঢাকা সফরে স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সম্পদ বণ্টনে ৪ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার চেয়েছে বাংলাদেশ। দেড় দশক স্থবির সম্পর্কের পর হওয়া ওই বৈঠকে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সংগঠিত গণহত্যার জন্য আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনার বিষয়টিও নিষ্পত্তির আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা। একইসঙ্গে ঢাকা জানায়, এ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে নিতে ‘একমত’ পাকিস্তান।
তবে আলোচিত বৈঠকটি শেষে পাকিস্তানের তরফ থেকে যে বিবৃতি পাওয়া গেছে, সেখানে ক্ষমা ও ক্ষতিপূরণে বাংলাদেশের দাবির বিষয়গুলো উঠে আসেনি।
এ বিষয়ে ইসলামাবাদের অবস্থান জানতে যোগাযোগ করা হয় পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিষয়ক) ইমরান আহমেদ সিদ্দিকি’র সঙ্গে। এই কূটনীতিক ২০২০-২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। যুগান্তরকে তিনি বলেছেন, পাকিস্তান মনে করে বাংলাদেশের দাবি ‘প্রতিষ্ঠিত চুক্তির আওতায় নিষ্পত্তি হয়েছে’। ইমেইলে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন যুগান্তর অনলাইনের আন্তর্জাতিক বিভাগের সহ-সম্পাদক আবদুল মজিদ চৌধুরী।
যেখানে জানতে চাওয়া হয়, অতীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার বহুল আলোচিত বৈঠক নিয়েও। তবে ‘কূটনৈতিক সৌজন্যতা’ দেখিয়ে সেই বৈঠক সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট প্রতিক্রিয়া দেখাননি তিনি। তবে কথা বলেছেন আঞ্চলিক নানা ইস্যু নিয়ে।
যুগান্তর অনলাইন: বাংলাদেশ ১৯৭১-পূর্ববর্তী সম্পদের জন্য পাকিস্তানের কাছে ৪ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার দাবি করেছে এবং ১৯৭১ সালের গণহত্যার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ্য ক্ষমা প্রার্থনার দাবিও জানিয়েছে। সম্প্রতি পাকিস্তানি পররাষ্ট্র সচিব আমনা বালুচের ঢাকা সফরে এফওসি-স্তরের বৈঠকে এই ইস্যুটি উত্থাপন করেছে ঢাকা। এ বিষয়ে ইসলামাবাদের অবস্থান কী? আপনি কি মনে করেন- এটি বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের উন্নয়নে একটি মাইলফলক হবে?
ইমরান আহমেদ সিদ্দিকি: ১৫ বছর পর এফওসি (ফরেন অফিস কনসালটেশন) পুনরায় শুরু হওয়া পাকিস্তান-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এই বৈঠক ছিল গঠনমূলক ও ভবিষ্যতমুখী, যেখানে উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। দুদেশের মধ্যে এমন কিছু (আলোচ্য) বিষয়ও ছিল, যেগুলো পাকিস্তান তার দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত চুক্তির আওতায় নিষ্পন্ন বলে মনে করে।
যুগান্তর অনলাইন: ২০১০ সালের পর এটি ছিল এফওসি-স্তরের প্রথম বৈঠক। আপনি কি আত্মবিশ্বাসী, বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের মধ্যে এই ধরনের বৈঠক নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হবে?
ইমরান আহমেদ সিদ্দিকি: এফওসি চালু না রাখার পক্ষে কোনো কারণ নেই। এটি একটি মূল্যবান চ্যানেল, যা সম্পর্ক গভীর করতে এবং পারস্পরিক স্বার্থ অগ্রসর করতে সহায়ক।
যুগান্তর অনলাইন: বাংলাদেশে পাকিস্তানের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে, আপনি ২০২০ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ ২০২০ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ, ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্ক জোরদার করার লক্ষ্যে। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগে অনাগ্রহী ছিলেন এবং দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলোতে প্রায়ই ভারতের পরামর্শ নিতেন। এটি ছিল পাকিস্তানি দূতের সঙ্গে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ‘২০২০ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ’। আপনার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, পাকিস্তান সম্পর্কে শেখ হাসিনার দৃষ্টিভঙ্গি এবং সেই বৈঠকটি কেমন ছিল?
ইমরান আহমেদ সিদ্দিকি: অতীতের চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও, ভবিষ্যতের সম্ভাবনা এবং দুই ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের মধ্যে সহযোগিতা ও অংশীদারিত্বের বিশাল সুযোগকে সামনে রেখেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের মধ্যে একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ থেকে শুরু করে আঞ্চলিক সহযোগিতা, উন্নয়ন এবং জনসাধারণের মধ্যে যোগাযোগ—বহুমাত্রিক খাতে সম্পর্ক জোরদারের সুযোগ রয়েছে। বন্ধুত্বপূর্ণ মানসিকতা ও সাধারণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সদিচ্ছা থাকলে আমরা একসঙ্গে অনেক কিছু অর্জন করতে পারি। ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য অপার সম্ভাবনাময় এবং সেই ভবিষ্যতের দিকেই আমাদের মনোনিবেশ করতে হবে—অতীতের বাধাগুলো পেছনে ফেলে একটি শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ আগামীর জন্য অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে হবে।
২০২০ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে তৎকালীন পাকিস্তান হাইকমিশনার ইমরান আহমেদ সিদ্দিকি। ছবি: সংগৃহীত
যুগান্তর অনলাইন: যখন শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন, তখন আমরা দেখি বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্ক পুনর্গঠনে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের আগ্রহের প্রেক্ষাপটে জানতে চাই—পাকিস্তানেও কি এ ধরনের কোনো উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হয়েছিল?
ইমরান আহমেদ সিদ্দিকি: বাংলাদেশের সঙ্গে একটি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা এবং উন্নয়ন ও আঞ্চলিক শান্তির অভিন্ন আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলতে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ। একটি ভ্রাতৃপ্রতিম রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান শুভেচ্ছার মনোভাব নিয়ে বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ করছে। আমরা আশাবাদী, বাংলাদেশের জনগণ এমন একটি পথ বেছে নেবে যা তাদের টেকসই অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করবে।
প্রত্যেক দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট গঠিত হয়, সেই দেশের নিজস্ব ইতিহাস ও অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার ভিত্তিতে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার সেই দেশের জনগণের হাতেই থাকে। বাংলাদেশকে আমরা কেবল অংশীদার হিসেবে নয়, বরং একটি ভ্রাতৃপ্রতিম জাতি হিসেবে দেখি—যাদের সঙ্গে আমাদের একটি টেকসই ও লালিত সম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্ককে আরও গভীর ও অর্থবহ করে তুলতে পাকিস্তান প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
যুগান্তর অনলাইন:হাসিনা-পরবর্তী সময়ে কূটনৈতিক বাধা হ্রাস পাওয়ায় পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এই এপ্রিলেই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে। এই সফর ঘিরে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ উদ্দেশ্য কী?
ইমরান আহমেদ সিদ্দিকি: পাকিস্তান এই আসন্ন সফরকে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে দেখছে—যা আমাদের দুই দেশের গভীর ভ্রাতৃসুলভ সম্পর্ককে পুনঃনিশ্চিত করে এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও অভিন্ন সমৃদ্ধির ভিত্তিতে এক নতুন অংশীদারত্বের পথ খুলে দেয়।
বিগত কয়েক দশকে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ ভিন্ন ভিন্ন অথচ পরিপূরক উন্নয়নের পথ অনুসরণ করেছে, এবং একে অপরের কাছ থেকে শেখার অনেক কিছু রয়েছে। এই সফর হবে এক সেতুবন্ধন—যা আমাদেরকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগের নতুন পথে যুক্ত করবে। সে অনুযায়ী, সর্বোচ্চ উদ্দেশ্যটি খুবই স্পষ্ট: একটি নতুন অধ্যায় শুরু করা, যেটি আমাদের ঐক্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে।
বাংলাদেশের চলমান অগ্রগতির অংশীদার হতে চায় পাকিস্তান—বাণিজ্য ও বিনিয়োগ থেকে শুরু করে প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট খাতে অবদান রাখতে আগ্রহী। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এবং পাকিস্তান প্রস্তুত ভবিষ্যতমুখী এক সংলাপে অংশ নিতে—যা কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নয়, বরং আঞ্চলিক সমন্বয়কেও জোরদার করবে। আমাদের সামনে অনেক পথ বাকি, তবে এই সফর সেই লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
যুগান্তর অনলাইন: রোহিঙ্গা সংকট ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে, আর আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের দৃঢ় সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রচেষ্টায় পাকিস্তান আরও সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে না কেন?
ইমরান আহমেদ সিদ্দিকি: পাকিস্তান সবসময়ই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দুর্দশা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। জাতিসংঘের জেনেভা দফতরে মানবাধিকার ও মানবিক ইস্যুতে ওআইসি গ্রুপের সমন্বয়কারীর ভূমিকায় থেকে পাকিস্তান এই সংকটটি আন্তর্জাতিক প্রাসঙ্গিক মঞ্চে বারবার তুলে ধরেছে। মিয়ানমারে মুসলিম সম্প্রদায়ের পরিস্থিতি নিয়ে গৃহীত ওআইসি প্রস্তাবসমূহে পাকিস্তান ধারাবাহিকভাবে সমর্থন জানিয়ে এসেছে।
পাকিস্তানের বিশ্বাস, মিয়ানমারে সব সম্প্রদায়ের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা, এবং তাদের মৌলিক অধিকার যেমন নাগরিকত্ব, ধর্ম পালনের স্বাধীনতা, শিক্ষা ও নিরাপত্তা প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করা—দেশটির শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত জরুরি।
যুগান্তর অনলাইন: ভারতের অনীহা সত্ত্বেও, সার্ক পুনরুজ্জীবন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে, যেখানে প্রধান উপদেষ্টা আহ্বান জানিয়েছেন। পাকিস্তান বরাবরই সার্ক পুনরায় সক্রিয় করার পক্ষে। আপনার দৃষ্টিতে, নিকট ভবিষ্যতে সার্কের পুনর্জাগরণের সম্ভাবনা কতটা?
ইমরান আহমেদ সিদ্দিকি: পাকিস্তান সবসময় বিশ্বাস করে এসেছে, এই অঞ্চলের সমৃদ্ধি সংলাপ, সহযোগিতা এবং যৌথ স্বার্থে গঠিত আঞ্চলিক কাঠামোকে শক্তিশালী করার মাধ্যমেই সম্ভব। সার্কের জন্ম হয়েছে দক্ষিণ এশীয় উন্নয়ন ও একত্রীকরণের একটি মঞ্চ হিসেবে—এটিকে কোনো স্বার্থান্বেষী উদ্দেশ্যের বলি হতে দেয়া উচিত নয়। সার্কের পুনর্জীবন কোনো বিকল্প নয়, এটি এখন একটি অনিবার্য প্রয়োজন।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মতো নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্বরা সার্ক পুনরায় কার্যকর করার যে আহ্বান জানিয়েছেন, পাকিস্তান তা আন্তরিকভাবে স্বাগত জানায়। একটি কার্যকর ও কর্মক্ষম সার্ক, যা কৃত্রিম বাধামুক্ত, এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী চালিকাশক্তি হতে পারে। তবে এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য সব সদস্য রাষ্ট্রকে আঞ্চলিক সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রদর্শন করতে হবে।
গত ডিসেম্বরে কায়রোতে ডি-৮ শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ ও বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ যে এই প্রক্রিয়াকে পুনরুজ্জীবিত করতে সক্রিয় উদ্যোগ নিচ্ছে, তা প্রশংসনীয়। পাকিস্তান এমন যে কোনো পদক্ষেপকে সমর্থন করতে প্রস্তুত, যা এই গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনে নতুন প্রাণ সঞ্চার করে। দক্ষিণ এশিয়ার সামনে যে চ্যালেঞ্জগুলো—অর্থনৈতিক দুর্বলতা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং উন্নয়নের বৈষম্য—তা মোকাবিলার জন্য যৌথ সমাধান অপরিহার্য। একটি নবজাগরিত সার্ক আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতির পক্ষে একটি কার্যকর শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। এখন সময় এসেছে, আমরা সবাই পার্থক্য ভুলে একসঙ্গে ভবিষ্যতের পথে হাঁটি।
যুগান্তর অনলাইন: সম্প্রতি বাংলাদেশে যে কোনো ধরনের পাকিস্তানি উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়ে ইসলামাবাদের আনুষ্ঠানিক অবস্থান কী?
ইমরান আহমেদ সিদ্দিকি: পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সম্পর্ক ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং জনগণের অভিন্ন আকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করে গোড়ায় উঠেছে। দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের পারস্পরিক শান্তিপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তোলার অধিকারকে কোনো বাইরের বক্তব্য খর্ব করতে পারে না। এমন কোনো দৃষ্টিভঙ্গি যা এই প্রাকৃতিক ও যৌক্তিক প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তা কেবল বিভ্রান্তিকর নয়—এটি কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূলনীতির পরিপন্থি।
পাকিস্তান দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, দক্ষিণ এশিয়াকে শত্রুতা ও অবিশ্বাসের সেকেলে ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ হওয়া উচিত শান্তি ও উন্নয়ননির্ভর, প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা নয়।
ইতিহাস প্রমাণ করেছে, স্থায়ী শান্তি গড়ে ওঠে পারস্পরিক সংলাপের মাধ্যমে, সন্দেহের মাধ্যমে নয়। পাকিস্তান আশা করে, আঞ্চলিক সব রাষ্ট্রই এই বাস্তবতাকে উপলব্ধি করবে এবং এমন এক পরিবেশ গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবে, যেখানে অর্থনৈতিক অগ্রগতি, আন্তঃসংযোগ এবং পারস্পরিক সম্মান আধিপত্যবাদী মনোভাবের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে। বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে—দক্ষিণ এশিয়া যেন পেছনে না পড়ে।
যুগান্তর অনলাইন: আপনি করেছেন। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে আবারও ঢাকায় আসার বিষয়টি আপনি কি কখনো কল্পনা করেছিলেন? এটি কি আপনার কূটনৈতিক জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়?
ইমরান আহমেদ সিদ্দিকি: ঢাকা হচ্ছে দৃঢ়তা ও অগ্রগতির প্রতীক। পরিবর্তিত এই রাজনৈতিক বাস্তবতায় ফিরে আসা আমাদের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার বন্ধন আরও সুদৃঢ় করার একটি সুযোগ হিসেবে এসেছে।
পাকিস্তান বরাবরই বাংলাদেশের নেতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। একটি দেশের রাজনৈতিক রূপান্তর তার অগ্রযাত্রার স্বাভাবিক অংশ, যা নতুন সম্ভাবনা ও উন্নয়নের দ্বার উন্মোচন করে। এ ধরনের সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনগণের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষা—একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নির্মাণ।
আমরা বাংলাদেশের জনগণের প্রজ্ঞা ও সংকল্পের প্রতি আস্থাশীল—তারা জাতীয় লক্ষ্যে একত্রিত হয়ে এগিয়ে যাবে। এই মুহূর্তটি সংলাপ, সহযোগিতা এবং অভিন্ন অগ্রগতির মূল্যবোধকে নতুন করে দৃঢ় করার সুযোগ। পাকিস্তান সর্বদা বাংলাদেশের সঙ্গে একটি গঠনমূলক ও ভবিষ্যতমুখী অংশীদারত্ব গড়ে তোলার পক্ষে অটল—যা শুধু আমাদের দুই দেশের জন্য নয়, গোটা অঞ্চলের জন্যও কল্যাণ বয়ে আনবে।
মার্চে ঢাকায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মোঃ জসীম উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠকে ইমরান আহমেদ সিদ্দিকি। ছবি: সংগৃহীত
যুগান্তর অনলাইন:পাকিস্তানের অনেক করছে, আবার বাংলাদেশেও উর্দুভাষী সম্প্রদায় নানা সামাজিক-অর্থনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি। আপনি কী ধরনের পদক্ষেপ বা নীতিকে প্রয়োজনীয় মনে করেন, যা উভয় সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়ন ও তাদের জন্য আরও ভালো সুযোগ নিশ্চিত করতে পারে?
ইমরান আহমেদ সিদ্দিকি: পাকিস্তান প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে, তার সব নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হবে, যাতে তারা জাতীয় উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে এবং সেই উন্নয়নের সুফল ভোগ করতে পারে। সরকার সকল সম্প্রদায়ের চাহিদার প্রতি সচেতন এবং এমন নীতিমালা বাস্তবায়নে সচেষ্ট, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও সামাজিক সাম্য নিশ্চিত করে।
এই চেতনা থেকেই আমরা বিশ্বাস করি—অবহেলিত গোষ্ঠীগুলোর অধিকার রক্ষা এবং উন্নয়নের মূলস্রোতে তাদের অন্তর্ভুক্তি একটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। ভবিষ্যতে আরও লক্ষ্যনির্ভর ও সম্প্রদায়ভিত্তিক কর্মসূচির মাধ্যমে এই দুই সম্প্রদায়ের আর্থ-সামাজিক অবস্থার দৃশ্যমান উন্নয়ন সম্ভব।