থামছে না মা ইলিশ ধরা; এখনই প্রয়োজন টেকসই পরিকল্পনা

Mofossal Barta
প্রকাশিত October 10, 2026, 17:23 PM
থামছে না মা ইলিশ ধরা; এখনই প্রয়োজন টেকসই পরিকল্পনা
সংবাদটি শেয়ার করুন....

শুরু হয়ে গেছে ২২ দিনের ইলিশ রক্ষা অভিযান। এ অভিযান সফল করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা- কর্মচারীরা অফিস আদালত ছেড়ে নেমে গেছেন নৌকা বাইচে। এতে অংশগ্রহণ করবেন প্রশাসনের লোকজন, আমাদের গণমাধ্যমকর্মী-সাংবাদিক বনাম জেলেরা, সাথে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও। অথচ, দুদিনের অভিযান শেষ হলো তবে থামছে না ইলিশ ধরা। এখনই জরুরী ভিত্তিতে প্রয়োজন টেকসই পরিকল্পনা গ্রহন করা; নয়তো ইলিশ সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে মনে হয়না।
‎
‎বাইশ দিনের এ অভিযানে সচেতনতার পাশাপাশি চলবে ইলিশ ধরা জাল-জেলে ও নৌকা আটক, ভ্রাম্যমান আদালতে কারাদণ্ড, নৌকা-জাল পোড়ানো কর্মসূচী। তবে এই কর্মসূচী বছরের পর বছর চলছে অথচ ইলিশের কেজি ৩ হাজারে দাড়িয়েছে। সাধারণ মানুষেরা ইলিশ খাওয়া দূরের কথা ইলিশের গন্ধ পায়না বহুবছর, এমন মানুষের সংখ্যা কিন্তু কম হবে না।
‎
‎এক সময়কার মাছে ভাতে বাঙালী প্রবাদটি এখন নিছক গল্প আর বিনোদন ছাড়া কিছুই নয়। সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির পথে। সংশ্লিষ্ট মৎস্য অধিদপ্তর টেকসই, বাস্তবভিত্তিক এবং সমন্বিত উদ্যোগ না নেওয়ায় ইলিশসহ মৎস্য সম্পদ আজ ধ্বংস এবং বিলুপ্তির মুখে। দেশীয় মাছ ইলিশ নিয়ে টেকসই পরিকল্পনা না থাকায় তা আজ সাধারণ মানুষের কাছ থেকে দূরে-স্বপ্নের মত।
‎
‎ইলিশ শুধু একটি মাছের নাম নয়। এটি বাংলাদেশের নদী, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, জীবিকা ও জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি জাতীয় সম্পদ। দেশের মানুষের খাদ্যতালিকা থেকে শুরু করে জেলে পরিবারের জীবন-জীবিকা সবখানেই ইলিশের গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি রয়েছে। তাই ইলিশ রক্ষা মানে শুধু একটি মাছের প্রজাতি রক্ষা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থাকে সুরক্ষা দেওয়া।
‎
‎মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল প্রায় ৫.২৯ লাখ মেট্রিক টন, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২০ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা। দেশের মোট মাছ উৎপাদনে একক প্রজাতি হিসেবে ইলিশের অবদান প্রায় ১২ শতাংশ। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় ইলিশ সংরক্ষণকে আর বিচ্ছিন্ন কোনো কর্মসূচি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাপনা। নিষেধাজ্ঞা আছে, কিন্তু ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকর? ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের আহরণ নিষেধাজ্ঞা বহু বছর ধরে কার্যকর রয়েছে। সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০১৭ সালে প্রধান প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞার সময় ২২ দিনে উন্নীত করা হয়। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের সমন্বয়ে অভিযান পরিচালিত হয়।
‎
‎পাশাপাশি জাটকা সংরক্ষণ, ইলিশ অভয়াশ্রম পরিচালনা এবং জেলেদের বিকল্প আয় সৃষ্টির উদ্যোগও রয়েছে। বর্তমানে মৎস্য অধিদপ্তর পাঁচটি ইলিশ অভয়াশ্রম, বিকল্প আয়মূলক কার্যক্রম এবং নিষেধাজ্ঞার সময়ে খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা করছে।
‎কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে; শুধু নিষেধাজ্ঞা ও অভিযান দিয়ে কি ইলিশ রক্ষা সম্ভব? আমার উত্তর- না। নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজন, অভিযান প্রয়োজন, আইন প্রয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু এর পাশাপাশি দরকার নদী ও জলজ পরিবেশ রক্ষা, অবৈধ জাল নিয়ন্ত্রণ, জেলেদের বাস্তবভিত্তিক সহায়তা, বাজার ব্যবস্থাপনা, মৎস্য অবতরণকেন্দ্রের নজরদারি এবং সাধারণ মানুষের দায়িত্বশীল আচরণ।
‎
‎২০২৬ সালের ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা হবে। শুরু: ৮ অক্টোবর ২০২৬
‎শেষ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, মোট: ২২ দিন।
‎এ সময়ে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুত, বাজারজাত, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময় পুরোপুরি নিষিদ্ধ থাকবে।
‎
‎এ সংক্রান্তে গতমাসে রাজধানীর মিরপুর প্রেস ক্লাবের আয়োজনে ইলিশ সম্পদ রক্ষায় করণীয় বিষয় মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। প্রধান বক্তা হিসেবে সেখানে আমি মূলপ্রবন্ধ পাঠ করি এবং একটি প্রস্তাবনা তুলে ধরি। আমার প্রস্তাবনামতে প্রথম করণীয় বিষয় সেটা হলো ”সরকারের মৎস্য অধিদপ্তর থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে। যে প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ইলিশ প্রজনন এলাকার সকল প্রকার তালিকাভুক্ত জেলেদের মাছ ধরা নৌকা এবং জাল ৫ অক্টোবরের মধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তরের মৎস্য কর্মকর্তার নিকট জমা দিতে হবে এবং জমা স্লিপ সংগ্রহ করতে হবে। ঐ ২২ দিন জেলেদের নৌকা এবং জাল সরকারের নিকট জমা থাকবে। যে সকল জেলেরা নৌকা এবং জাল জমা দিবেন কেবল তাঁরাই সরকারের সুবিধা গ্রহন করতে পারবেন”।
‎
‎ সরকারের এ প্রজ্ঞাপনটি বাস্তবায়নের জন্য ইলিশ প্রজনন এলাকার নদী ও রাস্তাঘাটে ব্যাপক মাইকিং এবং সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জেলে এবং সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করা যেতে পারে। ঐ সময়ে ইলিশ প্রজনন মৌসুমে নদীতে মাছধরা নৌকা, জেলেদের জন্য ১৪৪ ধারা ঘোষণা করা যেতে পারে। এ প্রস্তাবনাটি সরকার কার্যকর করতে পারলে ইলিশ রক্ষা কার্যক্রমের নামে প্রজনন এলাকায় সরকারের ডিসি, এস পি, ম্যাজিস্ট্রেট এবং মৎস্য কর্মকর্তাদের সরকারি কাজ রেখে নদীতে নৌকা বাইচ করতে হতো না। প্রতি বছর ইলিশ রক্ষায় সরকারের বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকরাও জেলেদের দ্বারা মারধর, আক্রমণ এবং লাঞ্ছিতের শিকার হয়ে থাকেন। পাশাপাশি জেলেরা মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে কারাদণ্ডের শিকার হন এবং তাদের নৌকা জাল পুড়িয়ে ফেলা হয়। এতে জেলেদের কোটি কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়ে থাকে। এ মৌসুমে সারা দেশের শত শত জেলে কারাদণ্ডের শিকার হয়ে ঐ সকল পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করেন।
‎
‎ মা ইলিশকে প্রজননের পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে। ইলিশের জীবনচক্র নদী ও সমুদ্র দুই পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত।
‎তাই প্রজনন মৌসুমে নদীতে প্রজনন এলাকায় সব ধরনের অবৈধ জাল ব্যবহার বন্ধ, ইলিশ ধরার নৌযান ও সরঞ্জামের ওপর কার্যকর নজরদারি, নদীর গুরুত্বপূর্ণ প্রজননস্থলে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ, রাতের অভিযান জোরদার, নৌপথে সমন্বিত টহল, মাছের আড়ত ও অবতরণকেন্দ্রে নজরদারি একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে।
‎
‎বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞার সময় নদীতে অভিযান আছে কিন্তু বাজারে ইলিশ বিক্রি হচ্ছে এমন ব্যবস্থাপনা কার্যকর হতে পারে না। মাছ ধরার উৎস থেকে শুরু করে পরিবহন, আড়ত, বাজার এবং ভোক্তার টেবিল পর্যন