নিখোঁজ মিরাজ শেখকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁর স্ত্রী মুক্তা খাতুন। ২০ আগস্ট

admin
প্রকাশিত August 29, 2026, 23:20 PM
নিখোঁজ মিরাজ শেখকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁর স্ত্রী মুক্তা খাতুন। ২০ আগস্ট
সংবাদটি শেয়ার করুন....

সাত বছরের মাহির শেখ রাজধানীর একটি অনুষ্ঠানে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। ছলছল চোখ, মুখে আতঙ্ক। বুকের সঙ্গে একটি ছবি চেপে ধরে বারবার চারপাশে তাকাচ্ছে। যেন ভিড়ের মধ্যেই খুঁজছে ছবির মানুষটিকে। ছবির মানুষটি তার বাবা মিরাজ শেখ। মাহিরের পাশে মা মুক্তা খাতুন। কান্নায় ভেঙে পড়ছেন বারবার। এসেছেন মাহিরের ফুফু আর দাদি। গোটা একটা পরিবারের দাবি একটাই, গুমের শিকার ‘মিরাজকে ফিরিয়ে দাও’।

আগামীকাল ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। দিবসটি উপলক্ষে আজ শনিবার রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে এক সেমিনারের আয়োজন করে। সেখানে এসেছিলেন মিরাজের মতো গুমের শিকার ব্যক্তিদের ২০টির মতো পরিবার এবং গুম থেকে ফিরে আসা দুজন।

আলোচনা সভায় ভুক্তভোগীরা কেঁদেছেন, ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বর্তমান সরকারের সময়ও নতুন করে গুমের ঘটনা ঘটছে বলে দাবি তাঁদের। এ ঘটনায় তাঁরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। নতুন ‘গুম প্রতিরোধ আইন’ নিয়ে তাঁদের কেউ করেছেন ভর্ৎসনা। কেউ বলেছেন ‘বস্তা পচা আইন’। দাবি তুলেছেন গুমের তদন্ত যেন স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দেওয়া হয়। শেষে তাঁরা স্বজনদের ফিরে পাওয়ার দাবি জানিয়ে সরকারের একান্ত সাহায্য প্রার্থনা করেন।

অনুষ্ঠানে বাগেরহাটের নিখোঁজ মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খাতুন বলেন, ‘আমি নিজে দেখছি, কোস্টগার্ড আমার স্বামীকে নিয়া গ্যাছে। এহন তারা অস্বীকার করে।’ তিনি বলেন, মিরাজ সুন্দরবনে মাছ ধরার পাশাপাশি ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালাতেন। ১০ এপ্রিল (চলতি বছর) সন্ধ্যা সাতটার দিকে জয়মনির ঠোটা এলাকার একটি চায়ের দোকানের সামনে থেকে মিরাজকে সাদাপোশাকে থাকা দুজন কোস্টগার্ডের স্পিডবোটে তুলে নিয়ে যায়। এবং নিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর মোটরসাইকেলটি দোকানি আল-আমিনের জিম্মায় রেখে যায়। পরে ২১ এপ্রিল কোস্টগার্ড সদস্য রবিন পরিচয়ে এক ব্যক্তি চাবি দিয়ে খুলে মোটরসাইকেলটি নিয়ে যান। পরে তারা অস্বীকার করে যে মিরাজ তাদের কাছে নেই।’ মুক্তা বলেন, ‘আমি আমার স্বামীকে ফেরত চাই।’

গুমের শিকার এমন ভুক্তভোগী পরিবারের আরেকজন আনিশা ইসলাম ইনশা। তিনি বলেন, ২০১৯ সালের ১৯ জুন তাঁর বাবা ইসমাইল হোসেন বাতেন মিরপুর–১ থেকে গুম হন। এখনো কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এই সাত বছরেও বাবাকে পাননি। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়েও গুম হচ্ছে। ছোট্ট মাহির এসেছে ছবি হাতে তার বাবাকে খুঁজতে। কান্না জড়ানো কণ্ঠে আনিশা বলেন, ‘আমি এ ঘটনার নিন্দা জানাই। নতুন এই আইনের নিন্দা জানাই। আমি আমার বাবাকে চাই। আমি ছোট্ট মাহির শেখের বাবাকে ফেরত চাই। আমি চাই আর কোনো গুম না হোক।’

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ভুক্তভোগী পরিবারের আরেকজন আমেনা আক্তার। তিনি বলেন, তাঁর স্বামী ফিরোজ খান বিএনপির রাজনীতি করতেন। বরিশালের ওয়ার্ড ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন। ২০১২ সালের ২৪ আগস্ট তাঁকে গুম করে তৎকালীন সরকার। সেই সময় র‍্যাব তাঁকে গুম করে। আজও তাঁর সন্ধান মেলেনি।

মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের প্রোগ্রাম পরিচালক সাজ্জাদ হোসাইন সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন। অনুষ্ঠানে সংগঠনটির ট্রেনিং অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি পরিচালক তাসনিম ফারহানা লিখিত বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি বলেন, ২৭ আগস্ট গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়ায় কিছুটা পরিবর্তন করে জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়। এই আইনের ১৪(৩) ধারায় বলা হয়েছে, শৃঙ্খলা বাহিনী বা তার কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত সংশ্লিষ্ট বাহিনী পরিচালনা করতে পারবে না এবং ওই ক্ষেত্রে সরকার ওই অভিযোগের তদন্তভার অভিযুক্ত বাহিনী ব্যতিরেকে অন্য কোনো বাহিনী বা আন্তঃবাহিনীর তদন্ত দলের কাছে অর্পণ করতে পারবে। কিন্তু এটি বাস্তবায়নযোগ্য নয়। কারণ, পুলিশসহ যেকোনো শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক গুমের তদন্ত পক্ষপাতদুষ্ট হবে।

লিখিত বক্তব্যে তাসনিম ফারহানা আরও বলেন, এই আইনে অভিযোগটি আদালতে মিথ্যা বিবেচিত হলে অভিযোগকারীর পাঁচ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড হতে পারে। এটি বিচারহীনতার পথকে আরও প্রশস্ত করবে।

বক্তব্যের শেষে তিনি সরকারের কাছে তিন দফা দাবি উল্লেখ করে বলেন, গুমের অভিযোগ তদন্ত করার ক্ষমতা শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে না দিয়ে স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর তদন্তভার দিতে হবে এবং তা আইনে উল্লেখ করতে হবে। গুমের শিকার যেসব ব্যক্তি এখনো ফিরে আসেননি, তাঁদের স্ত্রী-সন্তানেরা যাতে গুম হওয়া ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব পরিচালনাসহ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারেন, সে ব্যবস্থা করতে হবে; এবং যে সমস্ত ব্যক্তি গুমের পর ফেরত এসেছেন, তাঁদের অনেকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। এমনকি কাউকে কাউকে মিথ্যা সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বা নির্যাতন করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করে নিম্ন আদালতকে ব্যবহার করে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। এই সমস্ত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।

নতুন এই আইনকে ‘বস্তা পচা আইন’ বলে মন্তব্য করেছেন সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের শিকার এই ভুক্তভোগী বলেন, ‘নতুন আইনটি আরও বেশি গুম ও আরও বেশি খুনের ছাড়পত্র দিচ্ছে। এই আইনে গুমের সুষ্ঠু তদন্তের বিধান তো নেই–ই; বরং ভয় দেখানো হচ্ছে গুমের অভিযোগ আনলে পরিবারকেও জেলে যেতে হবে। এক বাহিনীর অভিযোগ আরেক বাহিনী তদন্ত করবে। আমাদের বোঝানো হচ্ছে ডান হাত অপরাধ করলে বাম হাত তদন্ত করবে এবং সেটা নিরপেক্ষভাবে। আমাদের কি বোকা মনে করেন?’

শেষ বক্তব্যে সংসদ সদস্য ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি মাহবুব উদ্দীন খোকন বলেন, ‘ইলিয়াসকে (বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী) তো আমরা এখনো পাইনি। তাহলে ইলিয়াসের পরিবার গুমের যে অভিযোগ করেছিল, তা তো এখনো প্রমাণ হয়নি। তাহলে অভিযোগদাতার কি জেল হবে? যে অভিযোগ পুলিশ প্রমাণ করতে পারেনি তদন্ত করে, ডিবি পারেনি। আর সিভিলে ভুক্তভোগী পরিবার কীভাবে পারবে?…আইনটা সর্বজনীন হতে হবে।’

এ ছাড়া অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসিনুর রহমান, সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং নিখোঁজ অবস্থা থেকে ফিরে আসা মারুফ জামান এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনের হিউম্যান রাইটস অফিসার জাহিদ হোসেন প্রমুখ।