সাইফুল ইসলাম রুদ্র, নরসিংদী জেলা প্রতিনিধি
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজাকে ঘিরে নরসিংদীতে শুরু হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। জেলার ছয় উপজেলায় এবার ৩৬১টি মণ্ডপে এই পূজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। উৎসবকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে প্রতিমা তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃৎশিল্পীরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অধিকাংশ প্রতিমার কাঠামো তৈরির কাজ শেষ হয়েছে। বাঁশ, কাঠ, খড় ও কাদামাটি দিয়ে গড়ে তোলা প্রতিমায় এখন চলছে মাটির প্রলেপ, সূক্ষ্ম কারুকাজ এবং রং-তুলির শেষ আঁচড়। প্রতিমা শিল্পীদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ রূপ পাচ্ছেন দেবী দুর্গা, সরস্বতী, লক্ষ্মী, কার্তিক ও গণেশ।
সরেজমিনে নরসিংদী শহরের কয়েকটি পূজা মণ্ডপ ও প্রতিমা তৈরির কারখানা ঘুরে দেখা যায়, শিল্পীরা কেউ প্রতিমার মুখ মণ্ডল ও চোখের নিখুঁত কাজ করছেন, আবার কেউ পোশাক ও অলংকারের নকশা ফুটিয়ে তুলছেন। কোথাও চলছে রং করার কাজ, আবার কোথাও শেষ মুহূর্তের কারুকাজে ব্যস্ত কারিগররা।
প্রতিমা শিল্পীরা জানান, প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয় কয়েক মাস আগে। প্রথমে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে কাঠামো তৈরি করা হয়। এরপর খড় দিয়ে দেওয়া হয় প্রতিমার অবয়ব। কয়েক ধাপে কাদামাটির প্রলেপ দেওয়ার পর তা শুকিয়ে গেলে শুরু হয় সূক্ষ্ম কারুকাজ। সবশেষে রং, অলংকার ও সাজসজ্জার কাজ সম্পন্ন করে প্রতিমা পৌঁছে দেওয়া হয় পূজামণ্ডপে।
নরসিংদী শহরের সেবা সংঘ এলাকার প্রতিমা শিল্পী সবুজ দাস বলেন, “অন্যান্য বছরের মতো এবারও প্রতিমার চাহিদা রয়েছে। তবে, বাঁশ, কাঠ, খড়, মাটি, রংসহ প্রয়োজনীয় উপকরণের দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে কারিগরদের মজুরিও বেড়েছে। ফলে প্রতিমার দাম কিছুটা বাড়লেও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রত্যাশিত লাভ হচ্ছে না।”
তিনি বলেন, “দুর্গাপূজার সময় যত ঘনিয়ে আসছে, কাজের চাপও তত বাড়ছে। একটি প্রতিমা তৈরিতে আকার, নকশা ও কারুকাজের ওপর নির্ভর করে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগে। বড় ও বিশেষ নকশার প্রতিমা তৈরিতে সময় ও শ্রম বেশি প্রয়োজন হয়।”
শিল্পীরা জানান, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার প্রতিমার চাহিদা ও দাম কিছুটা ভালো। তবে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি আয়ের সুযোগ খুব বেশি নেই। উৎসবের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিমার কাজ শেষ করতে দিন-রাত পরিশ্রম করছেন তারা।
এদিকে, দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পূজা উদযাপন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, জেলার প্রতিটি পূজামণ্ডপকে নিরাপত্তার আওতায় আনার পাশাপাশি মণ্ডপের আশপাশের পরিবেশ, বিদ্যুৎ সংযোগ, অগ্নিনিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পূজা চলাকালে দর্শনার্থীদের নির্বিঘ্ন চলাচল ও উৎসবের পরিবেশ বজায় রাখতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মণ্ডপগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং কয়েক স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়েও প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
নরসিংদী জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাখন দাস বলেন, “প্রতি বছরের মতো এবারো আমরা নির্বিঘ্নে পূজা উদযাপনের বিষয়ে আশাবাদী। নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের কোনো উদ্বেগ নেই। জেলা প্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।”
তিনি বলেন, “পূজা মণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উৎসব চলাকালে যেন কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।”
পূজা উদযাপন পরিষদ জানিয়েছে, নরসিংদীর ছয় উপজেলায় বর্তমানে ৩৬১টি পূজামণ্ডপের প্রস্তুতি চলছে। তবে চূড়ান্ত তালিকায় মণ্ডপের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে।