অনলাইন ডেক্স,
ফুটবল ইতিহাসে পেলে এমন এক কিংবদন্তি, যাঁর নামের পাশে রয়েছে তিনটি বিশ্বকাপ জয়ের অনন্য কীর্তি। ব্রাজিলকে তিনবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে সাহায্য করে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে। অসাধারণ দক্ষতা, দৃষ্টিনন্দন খেলা ও গোল করার সহজাত ক্ষমতা তাঁকে এনে দেয় বিশ্বজোড়া খ্যাতি।
১৯৫০ সালে ব্রাজিলের মারাকানা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের ফাইনালে উরুগুয়ের কাছে স্বাগতিকদের পরাজয় দেশজুড়ে গভীর হতাশা তৈরি করেছিল। সেই সময় সাও পাওলোর এক কিশোর বাবাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, একদিন ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ জেতাবেন। সেই কিশোরই এডসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো, যিনি বিশ্বজুড়ে পেলে নামে পরিচিত।
১৯৪০ সালের ২৩ অক্টোবর ব্রাজিলের সাও পাওলো রাজ্যের ট্রেস কোরাকয়েসে জন্মগ্রহণ করেন পেলে। বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসনের নাম অনুসারে তাঁর নাম রাখা হয়েছিল এডসন। ছোটবেলায় বন্ধুরা তাঁকে ‘ডিকো’ নামে ডাকত। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে ফুটবল কেনার সামর্থ্য ছিল না। তাই পুরোনো মোজায় খবরের কাগজ ভরে বল বানিয়ে খেলতেন তিনি।
গলিতে ফুটবল খেলার সময়ই তাঁর প্রতিভা নজরে আসে সাবেক ফুটবলার ওয়ালডেমার ডি ব্রিটোর। তাঁর উদ্যোগে মাত্র ১৫ বছর বয়সে সান্তোস ক্লাবে যোগ দেন পেলে। শুরুতে ক্লাবের ‘বি’ দলে খেললেও দ্রুতই মূল দলে জায়গা করে নেন। এরপর নিজের নৈপুণ্যে হয়ে ওঠেন ব্রাজিল জাতীয় দলের অন্যতম ভরসা।
১৯৫৮ সালে সুইডেনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে মাত্র ১৭ বছর বয়সে প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বাদ পান পেলে। ফাইনালে স্বাগতিক সুইডেনের বিপক্ষে গোল করে ব্রাজিলের শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। ১৯৬২ বিশ্বকাপেও শিরোপা জেতে ব্রাজিল। তবে চোটের কারণে ওই আসরের বেশির ভাগ ম্যাচে খেলতে পারেননি পেলে।
১৯৭০ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে আবারও নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন এই কিংবদন্তি। কার্লোস আলবার্তো, রিভেলিনো ও জাইরজিনহোদের নিয়ে গড়া ব্রাজিল দলটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা দল হিসেবে পরিচিতি পায়। সেই আসরে শিরোপা জিতে তিনটি বিশ্বকাপজয়ী একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে ইতিহাস গড়েন পেলে।
বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ক্যারিয়ারে ১ হাজার ৩৬৬ ম্যাচে ১ হাজার ২৮৩ গোল করার কৃতিত্ব রয়েছে তাঁর। ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে ৯২ ম্যাচে করেন ৭৭ গোল। দীর্ঘদিন জাতীয় দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা থাকার পর তাঁর সেই রেকর্ড ভেঙেছেন নেইমার।
ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোতে পেলের না খেলার পেছনেও ছিল বিশেষ পরিস্থিতি। তাঁর অসাধারণ প্রতিভা এবং জাতীয় দলের জন্য গুরুত্ব বিবেচনায় ব্রাজিল সরকার তাঁকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। ফলে ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবের আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও তাঁর দেশ ছাড়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বর ৮২ বছর বয়সে মারা যান পেলে। কাতার বিশ্বকাপ চলাকালে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ব্রাজিলের খেলা অনুসরণ করেছিলেন। মৃত্যুর পরও ফুটবলে তাঁর অবদান, তিনটি বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার ক্ষমতা তাঁকে অমর কিংবদন্তির মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।